ভারতের গণপরিষদ ভারতের গণপরিষদ (Constituent Assembly of India) ছিল স্বাধীন ভারতের সংবিধান রচনার জন্য গঠিত একটি ...

02A ভারতের গণপরিষদ

/
0 Comments

                        ভারতের গণপরিষদ

ভারতের গণপরিষদ (Constituent Assembly of India) ছিল স্বাধীন ভারতের সংবিধান রচনার জন্য গঠিত একটি ঐতিহাসিক সভা। এটি ১৯৪৬ সালে গঠিত হয় এবং ১৯৪৯ সালের ২৬ নভেম্বর সংবিধান গৃহীত হয়। গণপরিষদের কাজ ছিল শুধু সংবিধান লেখা নয়, বরং স্বাধীন ভারতের রাজনৈতিক, সামাজিক ও অর্থনৈতিক ভিত্তি তৈরি করা। নিচে এর প্রয়োজনীয়তা, উদ্ভব, গঠন, কার্যকারিতা ও সমালোচনা বিস্তারিতভাবে আলোচনা করা হলো।

১. ভারতে গণপরিষদের প্রয়োজনীয়তা

স্বাধীনতার পর ভারতের জন্য একটি নিজস্ব সংবিধান অপরিহার্য হয়ে পড়ে। ব্রিটিশ শাসনকালে ভারতে যেসব আইন চালু ছিল (যেমন ১৯৩৫ সালের ভারত শাসন আইন), সেগুলো ছিল উপনিবেশিক ও একচ্ছত্র। এগুলো স্বাধীন গণতান্ত্রিক ভারতের উপযুক্ত ছিল না। গণপরিষদের মূল প্রয়োজন ছিল:

  • জনগণের প্রতিনিধিত্বে সংবিধান রচনা করা, যাতে এটি ব্রিটিশ-আরোপিত না হয়ে জন-আকাঙ্ক্ষিত হয়।

  • কেন্দ্র-রাজ্য ক্ষমতা বণ্টন, মৌলিক অধিকার, নাগরিকত্ব, নির্বাচনী ব্যবস্থা ইত্যাদি নির্ধারণ করা।

  • সাম্প্রদায়িক বিভেদ, রাজনৈতিক অস্থিরতা ও দেশবিভাগের পরও জাতীয় ঐক্য বজায় রাখা।

এটি ছিল ভারতীয় জাতীয়তাবাদের চূড়ান্ত প্রকাশ — “ভারতীয়রা নিজেরাই নিজেদের ভাগ্য নির্ধারণ করবে” এই দাবির বাস্তব রূপ।

২. ভারতে গণপরিষদের উদ্ভব (Evolution)

গণপরিষদের ধারণা হঠাৎ করে আসেনি; এটি দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক আন্দোলনের ফল।

  • ১৯২২ সাল: মহাত্মা গান্ধী ‘ইয়ং ইন্ডিয়া’ পত্রিকায় প্রথম গণপরিষদের দাবি তোলেন।

  • ১৯৩৪ সাল: এম.এন. রায় সর্বপ্রথম আনুষ্ঠানিকভাবে গণপরিষদ গঠনের প্রস্তাব দেন।

  • ১৯৩৫ সাল: কংগ্রেস দল গণপরিষদের দাবি করে।

  • ১৯৪২ সাল: ক্রিপস মিশন গণপরিষদের প্রস্তাব দেয়, কিন্তু ব্যর্থ হয়।

  • ১৯৪৬ সাল: ক্যাবিনেট মিশন (ব্রিটিশ সরকারের প্রতিনিধিদল) ভারতে আসে এবং গণপরিষদ গঠনের সুপারিশ করে। এটিই চূড়ান্ত পদক্ষেপ।

এভাবে ধীরে ধীরে গণপরিষদের ধারণা বিকশিত হয় এবং স্বাধীনতা আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত হয়।

৩. ভারতে গণপরিষদের গঠন (Formation)

ক্যাবিনেট মিশন প্ল্যান অনুসারে ১৯৪৬ সালে গণপরিষদ গঠিত হয়।

  • সদস্যসংখ্যা: প্রথমে ৩৮৯ জন (ব্রিটিশ শাসিত প্রদেশ থেকে ২৯৬, দেশীয় রাজ্য থেকে ৯৩)। দেশবিভাগের পর সংখ্যা কমে ২৯৯ হয়।

  • নির্বাচন পদ্ধতি: সরাসরি জনগণের ভোটে নয়, প্রাদেশিক আইনসভাগুলো (যেগুলো ১৯৪৬ সালের নির্বাচনে গঠিত হয়েছিল) দ্বারা পরোক্ষ নির্বাচন। আসন বণ্টন হয় জনসংখ্যা অনুসারে এবং সাম্প্রদায়িক ভিত্তিতে (মুসলিম, শিখ, সাধারণ ইত্যাদি)।

  • প্রথম অধিবেশন: ৯ ডিসেম্বর ১৯৪৬, নয়াদিল্লিতে।

  • সভাপতি: ড. রাজেন্দ্র প্রসাদ।

  • মুসলিম লীগের অবস্থান: লীগ প্রথমে বয়কট করে, পরে পাকিস্তান গঠিত হলে তাদের সদস্যরা চলে যান।

গণপরিষদে কংগ্রেসের আধিপত্য ছিল সবচেয়ে বেশি, কিন্তু আইনজ্ঞ, সমাজসেবী, নারী ও সংখ্যালঘু প্রতিনিধিও ছিলেন।

৪. ভারতে গণপরিষদের কার্যকারিতা (Functioning)

গণপরিষদের কাজ ছিল অত্যন্ত সুশৃঙ্খল ও গণতান্ত্রিক।

  • মোট অধিবেশন: ১১টি (৯ ডিসেম্বর ১৯৪৬ থেকে ২৪ জানুয়ারি ১৯৫০ পর্যন্ত)।

  • সময়কাল: ২ বছর ১১ মাস ১৮ দিন।

  • কমিটি ব্যবস্থা: বিভিন্ন কমিটি গঠিত হয়। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ছিল খসড়া কমিটি (Drafting Committee), যার চেয়ারম্যান ছিলেন ড. বি.আর. আম্বেদকর। অন্যান্য কমিটি: ইউনিয়ন কনস্টিটিউশন কমিটি (জওহরলাল নেহরু), ইউনিয়ন পাওয়ার্স কমিটি ইত্যাদি।

  • প্রক্রিয়া: প্রথমে উদ্দেশ্য প্রস্তাব (Objective Resolution) পাস হয় (১৯৪৭ সালের ১৩ ডিসেম্বর, নেহরু প্রস্তাব করেন)। তারপর খসড়া আলোচনা, সংশোধন ও চূড়ান্ত গ্রহণ।

  • ফলাফল: ২৬ নভেম্বর ১৯৪৯ সালে সংবিধান গৃহীত হয় (৩৯৫ ধারা, ৮টি তফসিল)। ২৬ জানুয়ারি ১৯৫০ সালে কার্যকর হয়।

গণপরিষদ শুধু সংবিধান রচনা করেনি, স্বাধীনতার পর প্রথম সংসদ হিসেবেও কাজ করেছে (১৯৫০ সাল পর্যন্ত)।

৫. সমালোচনা (Criticism)

গণপরিষদের সাফল্য সত্ত্বেও কিছু সমালোচনা রয়েছে:

  • প্রতিনিধিত্বের অভাব: সদস্যরা সরাসরি জনগণের ভোটে নির্বাচিত ছিলেন না (প্রাদেশিক পরিষদের মাধ্যমে)। তাই এটি পুরোপুরি জনপ্রতিনিধিত্বমূলক ছিল না।

  • কংগ্রেস-আধিপত্য: কংগ্রেস দলের সদস্য সংখ্যা ছিল সবচেয়ে বেশি (প্রায় ২০৮ জন)। কেউ কেউ এটিকে “কংগ্রেসের সংবিধান” বলে অভিহিত করেন।

  • সার্বভৌমত্বের অভাব: গণপরিষদ ব্রিটিশ সরকারের প্রস্তাব অনুসারে গঠিত হয়েছিল, তাই প্রথমদিকে এটি পুরোপুরি সার্বভৌম ছিল না।

  • সময় বেশি লাগা: সমালোচকরা বলেন, আমেরিকার সংবিধান মাত্র ৪ মাসে তৈরি হয়েছিল, অথচ ভারতের লেগেছে প্রায় ৩ বছর।

  • এলিট-শ্রেণির আধিপত্য: বেশিরভাগ সদস্যই আইনজ্ঞ, রাজনীতিবিদ ও শিক্ষিত শ্রেণির ছিলেন; সাধারণ কৃষক-শ্রমিকের প্রতিনিধিত্ব কম ছিল বলে অভিযোগ।

তবে এসব সমালোচনা সত্ত্বেও গণপরিষদের সাফল্য অস্বীকার করা যায় না। তৎকালীন উত্তাল পরিস্থিতিতে (দেশবিভাগ, দাঙ্গা, রাজনৈতিক অস্থিরতা) এত বড় সংবিধান শান্তিপূর্ণভাবে রচনা করা ছিল অসাধারণ কৃতিত্ব। গ্রেনভিল অস্টিনের মতো বিশেষজ্ঞরা বলেন, সর্বজনীন ভোটাধিকারের ভিত্তিতে নির্বাচন করলে কাজ আরও বিলম্বিত হতো।

উপসংহার

ভারতের গণপরিষদ ছিল জাতীয় জীবনের এক মাইলফলক। এটি শুধু সংবিধান রচনা করেনি, বরং গণতন্ত্র, সমতা ও ঐক্যের ভিত্তি স্থাপন করেছে। আজও আমাদের সংবিধানের মূল শক্তি এই গণপরিষদের দূরদর্শিতা ও সম্মিলিত প্রচেষ্টার ফল। এটি প্রমাণ করে যে, জনগণের ইচ্ছায় গঠিত প্রতিষ্ঠানই দীর্ঘস্থায়ী হয়।


পূর্ববর্তী চ্যাপ্টার: ভারতীয় সংবিধানের প্রধান বৈশিষ্ট্য সমূহ। 


পরবর্তী চ্যাপ্টার: ভারতের সংবিধানের প্রস্তাবনা 





You may also like

কোন মন্তব্য নেই: